বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে যাচ্ছে সরকার। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন উৎপাদনের লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে একটি আধুনিক ‘ড্রোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট’ স্থাপন করা হবে এবং একই সঙ্গে নিশ্চিত করা হবে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি হস্তান্তর (Transfer of Technology – ToT)।
গত ৬ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় “Establishment of Manufacturing Plant and Transfer of Technology (ToT) for Unmanned Aerial Vehicle (UAV)” শীর্ষক এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।
এর মধ্যে
-
প্রযুক্তি ও কারখানা স্থাপনে ব্যয়: ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা (বৈদেশিক মুদ্রায়)
-
অন্যান্য খরচ: ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা এলসি চার্জ ও ভ্যাট বাবদ দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে
এই অর্থ চার অর্থবছরে, ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (CETC) ইন্টারন্যাশনাল–এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। সিইটিসি বর্তমানে বিশ্বের ১১০টিরও বেশি দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শুধু ড্রোন উৎপাদনে সক্ষম হবে না, বরং ড্রোনের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও কারিগরি ব্যবস্থাপনাতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক নির্ভরতা কমবে এবং প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বহুগুণে বাড়বে।
প্রকল্পটি ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অনুমোদন লাভ করেছে। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বিস্তারিত মন্তব্য না করলেও জানিয়েছেন, আকাশ প্রতিরক্ষা ও ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে সব তথ্য প্রকাশ করা হবে।
উল্লেখ্য, এর আগেই গত সেপ্টেম্বরে বিডার (বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ড্রোন কারখানা স্থাপনের প্রাথমিক রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলো।
অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে কয়েকটি কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
-
বিমান বাহিনীকে তাদের বিদ্যমান বাজেটের “অন্যান্য যন্ত্রপাতি” খাত থেকেই এই ব্যয় নির্বাহ করতে হবে।
-
এ প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত কোনো বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে না।
-
সব অর্থ পরিশোধ করতে হবে এলসি (Letter of Credit) এর মাধ্যমে, অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রায় নির্ধারিত আর্থিক প্রক্রিয়ায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই কারখানা স্থাপিত হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে শুধু ড্রোন ব্যবহারকারী দেশ নয়, বরং ড্রোন উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হবে। এতে প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর চাপ কমবে, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
সব মিলিয়ে, ৬০৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বাংলাদেশকে আঞ্চলিকভাবে আরও শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পথে এগিয়ে নেবে।




