১৩,৫০০ কোটি টাকার বিরোধ: সমঝোতার ইঙ্গিত জিপি ও রবির

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on print

দীর্ঘ এক দশকের আইনি লড়াই ও তিক্ততার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সমঝোতার পথে হাঁটতে চায় দেশের দুই শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন (জিপি) ও রবি আজিয়াটা। অডিট আপত্তিতে সৃষ্ট হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া নিয়ে চলমান মামলার জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে সম্প্রতি তারা বিটিআরসি’র কাছে ‘সালিস’ বা মধ্যস্থতার (Arbitration) প্রস্তাব দিয়েছে। এক সময় এ বিষয়ে অনড় অবস্থানে থাকলেও এখন বিষয়টি বিবেচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।

প্রায় ১০ বছর আগে টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি গ্রামীণফোন ও রবিতে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ের কর, ভ্যাট, হ্যান্ডসেট রয়্যালটি, তরঙ্গের মূল্য পরিশোধ, লাইসেন্স ফিসহ বিভিন্ন খাতে এই নিরীক্ষা হয়। নিরীক্ষা শেষে গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা এবং রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বকেয়া পাওনার দাবি জানানো হয়।

এই দাবির বিপরীতে গ্রামীণফোন ইতোমধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং রবি ১৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। তবে শুরু থেকেই দুই অপারেটর নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অনেক দাবিকে ‘অযৌক্তিক ও বিতর্কিত’ বলে আপত্তি জানিয়ে আসছে। এ নিয়ে তারা আদালতেও মামলা করে এবং পরে সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেয়।

অন্যদিকে বিটিআরসি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের আইনে সালিস বা মধ্যস্থতার কোনো সুযোগ নেই। ফলে মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে এবং বকেয়া নিষ্পত্তি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে গ্রামীণফোন ও রবি আবারও সালিসের মাধ্যমে বকেয়া নিষ্পত্তির অনুরোধ জানিয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে। এতে করে দীর্ঘদিনের এই বিরোধের একটি সমঝোতামূলক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, সালিসের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে তা শুধু গ্রামীণফোন ও রবির জন্যই নয়, পুরো টেলিকম খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হবে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই বিরোধের কারণে অপারেটর দুটির বিনিয়োগ পরিকল্পনা, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মান উন্নয়নে প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের বকেয়া দাবি থাকায় নতুন বিনিয়োগে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, যা বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

টেলিকম খাতের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সালিস প্রক্রিয়ায় গেলে উভয় পক্ষই মুখ রক্ষা করে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে পারবে। আদালতের দীর্ঘসূত্রতা, আইনজীবী খরচ এবং অনিশ্চিত রায়ের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারও ধাপে ধাপে হলেও একটি বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের সুযোগ পাবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিটিআরসি যদি তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেই সালিস বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) প্রক্রিয়ার কোনো পথ খুঁজে বের করতে পারে, তাহলে এটি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। ভবিষ্যতে টেলিকম খাতের অন্যান্য বিরোধ নিষ্পত্তিতেও এই পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। এতে করে আদালতের ওপর চাপ কমবে এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠবে।

অন্যদিকে অপারেটর দুটির পক্ষ থেকেও নমনীয় অবস্থান নেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এক সময় যেখানে তারা পুরো দাবিকেই প্রত্যাখ্যান করছিল, এখন সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তববাদী সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে।

টেলিকম খাত সংশ্লিষ্ট আরেক বিশ্লেষক বলেন, “এই বিরোধ শুধু টাকা-পয়সার নয়, এটি নীতিনির্ধারণী স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশের প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। যদি সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেখাতে পারে যে তারা আলোচনার মাধ্যমে বড় করপোরেট বিরোধের সমাধান করতে সক্ষম, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।”

উল্লেখ্য, গ্রামীণফোন ও রবি দেশের সবচেয়ে বড় দুই মোবাইল অপারেটর। তাদের সম্মিলিত গ্রাহক সংখ্যা দেশের মোট মোবাইল গ্রাহকের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা পুরো টেলিকম ইকোসিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিটিআরসির দীর্ঘদিনের বিরোধ মিটে গেলে খাতটিতে নতুন করে গতি সঞ্চার হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ১৩,৫০০ কোটি টাকার এই বিরোধের সালিসি নিষ্পত্তির উদ্যোগ শুধু একটি মামলার সমাধান নয়, বরং এটি টেলিকম খাতের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। দীর্ঘদিনের সংঘাতের জায়গায় যদি সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে তা সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অপারেটর এবং সর্বোপরি গ্রাহক—সবার জন্যই সুফল বয়ে আনবে।

আরো পড়ুন

সিন্ডিকেটের হুমকি উপেক্ষা করে খুলে দেওয়া হলো বসুন্ধরা সিটি

অবৈধ মোবাইল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের ডাকা ধর্মঘট ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছেন বৈধ ব্যবসায়ীরা। আজ বুধবার সকাল থেকে দেশের অন্যতম...

Read more
খরচ বাড়েনি, গতি বেড়েছে তিন গুণ: বিটিসিএলের নতুন উদ্যোগ

গ্রাহকদের জন্য উন্নত ও আধুনিক ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে বড় ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। মাসিক...

Read more
৬০৮ কোটি টাকায় ড্রোন কারখানা: প্রতিরক্ষা খাতে বড় অগ্রগতি

বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে যাচ্ছে সরকার। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন উৎপাদনের লক্ষ্যে চীনের...

Read more
দেশজুড়ে ওয়াই-ফাই কলিং সেবা চালু করল বাংলালিংক

আনুষ্ঠানিকভাবে দেশজুড়ে ভয়েস ওভার ওয়াই-ফাই (ভিও ওয়াই-ফাই) কলিং সেবা চালু করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় উদ্ভাবনী ডিজিটাল অপারেটর বাংলালিংক। বাংলালিংকের এ সেবার...

Read more
বালুকণার চেয়েও ছোট যে রোবট

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রোবট তৈরি করেছেন। এই রোবটটি নিজের মতো চিন্তা ও নড়াচড়া...

Read more
Scroll to Top