বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালত গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) এ আদেশ দেন।
যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে তারা হলেন— ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের সেন্ট্রাল সাউথ ক্লাস্টার প্রধান সৈয়দ জিকরুল বিন জমির, ওয়ারীর সিনিয়র টেরিটরি ম্যানেজার এম সোয়াইব কামাল, সেন্ট্রাল সাউথ রিজিওনের এরিয়া ম্যানেজার কাওসার মাহমুদ চৌধুরী, কনজ্যুমার কেয়ারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ নাহারুল ইসলাম মোল্লা এবং ফাইন্যান্স ডিরেক্টর জিন্নিয়া হক।
মামলার নথি ও সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছরের ৭ আগস্ট ইউনিলিভার বাংলাদেশের পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘মাসুদ এন্ড ব্রাদার্স’ আদালতে মামলাটি দায়ের করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সাল থেকে ওয়ারী, সদরঘাটসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইউনিলিভারের ২৫০টিরও বেশি পণ্য নিয়মিতভাবে বাজারজাত করে আসছিল।
পণ্যের ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাত
বাদী পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত (ড্যামেজড) পণ্য ইউনিলিভারকে ফেরত দেওয়া হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব পণ্যের বিপরীতে নতুন পণ্য সরবরাহ অথবা অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তারা তা না করে ওই অর্থ আত্মসাৎ করেন।
অযৌক্তিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা ও পরিকল্পিত ক্ষতি
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়, বিবাদীরা অন্য পরিবেশকদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে বাদী প্রতিষ্ঠানকে অবাস্তব ও অযৌক্তিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেন। পাশাপাশি বাজারে চাহিদা নেই—এমন পণ্য জোরপূর্বক সরবরাহ করে পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে বাদী প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার লোকসান হয়।
মোট ক্ষয়ক্ষতি ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা
মামলার তথ্যানুযায়ী, প্রতারণা, আত্মসাৎ এবং নতুন পরিবেশক নিয়োগের মাধ্যমে বাদী প্রতিষ্ঠানের মোট ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন। এমনকি তারা বিভিন্ন সময় বাদী পক্ষকে ভয়ভীতি ও হুমকিও প্রদান করেছেন। তদন্তে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সিদ্ধান্ত নেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম হিরণ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান,
“বিবাদীরা সুচতুরভাবে পরিবেশকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সিআইডির নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য উদঘাটিত হওয়ায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।”
এই ঘটনায় দেশের কর্পোরেট অঙ্গনে এবং পরিবেশক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




